ক্রিকেটে কিছু গল্প আছে, যেখানে সাফল্যের চেয়ে সংগ্রামটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কিছু ক্রিকেটার আছেন, যাদের প্রতিভা দেখেই ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখা যায়, কিন্তু সেই স্বপ্নের পথে বারবার আসে বাধা। বাংলাদেশের ক্রিকেটে এমনই এক নাম—সাইফ হাসান।
৩০ অক্টোবর ১৯৯৮ সালে সৌদি আরবের রিয়াদে জন্মগ্রহণ করেন সাইফ হাসান। ছোটবেলার একটা সময় তার কেটেছে সৌদি আরবেই। তখন থেকেই ক্রিকেটের সঙ্গে তার পরিচয় হলেও ক্রিকেটকে পেশা হিসেবে নেওয়ার চিন্তা তখনো ছিল না। পরবর্তীতে তার বাবা সৌদি আরব থেকে বাংলাদেশে ফিরে আসেন। বাংলাদেশে আসার পর সাইফের ক্রিকেটের প্রতি আগ্রহ আরও বাড়তে থাকে। তিনি ধানমন্ডি ক্রিকেট একাডেমিতে নিয়মিত অনুশীলন শুরু করেন। আর সেখান থেকেই ধীরে ধীরে শুরু হয় তার ক্রিকেটার হয়ে ওঠার গল্প।
একজন তরুণ ক্রিকেটারের জীবনে পরিবারের সমর্থন কতটা গুরুত্বপূর্ণ, সাইফ হাসানের গল্প তারই একটি উদাহরণ। অনেক পরিবার যেখানে ক্রিকেটকে শুধুই শখ হিসেবে দেখে, সেখানে সাইফের বাবা-মা তার ক্রিকেটের স্বপ্নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াননি। বরং তারা তাকে অনুশীলন করার সুযোগ দিয়েছেন, খেলতে উৎসাহ দিয়েছেন এবং তার স্বপ্নকে এগিয়ে নিতে পাশে থেকেছেন। সাইফ নিজেই জানিয়েছেন, তার বাবা-মা কখনো তাকে ক্রিকেট থেকে দূরে থাকতে বলেননি। এই সমর্থনই হয়তো তাকে আরও আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছিল।
সাইফ ছোটবেলা থেকেই অনুশীলনের ব্যাপারে ছিলেন বেশ সিরিয়াস। দলের অন্যরা অনুশীলন শেষ করে চলে যাওয়ার পরও তিনি অনেক সময় নেটে থেকে ব্যাটিং করতেন। আরও কিছু বল খেলা, আরও কিছু শট অনুশীলন করা—এভাবেই নিজের ব্যাটিংকে ধীরে ধীরে তৈরি করতে থাকেন তিনি।
তার কঠোর পরিশ্রমের ফল খুব দ্রুতই দেখা যায়। মাত্র ১৮ বছর বয়সে জাতীয় ক্রিকেট লিগে ঢাকা বিভাগের হয়ে বরিশালের বিপক্ষে খেলতে নেমে সাইফ হাসান করেন অসাধারণ ২০৪ রান। সেই ইনিংস তাকে বাংলাদেশের সবচেয়ে কম বয়সী প্রথম শ্রেণির ডাবল সেঞ্চুরিয়ানদের একজন হিসেবে আলোচনায় নিয়ে আসে। ৪১০ বলের সেই ইনিংসে ছিল ২০টি চার ও একটি ছক্কা। তখন থেকেই বাংলাদেশের ক্রিকেটে সাইফ হাসানকে নিয়ে বড় স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন অনেকে।
বয়সভিত্তিক ক্রিকেটে ভালো পারফরম্যান্স, ঘরোয়া ক্রিকেটে ধারাবাহিকতা এবং বড় ইনিংস খেলার ক্ষমতা—সবকিছু মিলিয়ে ধীরে ধীরে জাতীয় দলের নির্বাচকদের নজরে চলে আসেন সাইফ। ২০১৯ সালে ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে তার ব্যাট আরও একবার কথা বলে। পুরো টুর্নামেন্টে তিনি করেন ৮১৪ রান। এরপর বাংলাদেশ ‘এ’ দলের হয়েও নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দেন তিনি।
অবশেষে আসে সেই কাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত। ৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০। পাকিস্তানের বিপক্ষে রাওয়ালপিন্ডিতে বাংলাদেশের টেস্ট দলে অভিষেক হয় সাইফ হাসানের। মাত্র ২১ বছর বয়সে জীবনের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন পূরণ করে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের মঞ্চে পা রাখেন তিনি। কিন্তু অভিষেকটা মোটেও তার মনের মতো হয়নি। পাকিস্তানের বাঁহাতি পেসার শাহীন শাহ আফ্রিদির বলে মাত্র শূন্য রানে আউট হয়ে ফিরে যান সাইফ। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের প্রথম ইনিংসেই ব্যর্থতা—যে কোনো তরুণ ক্রিকেটারের জন্যই এটা হতে পারে বড় ধাক্কা।
তবে একটা ম্যাচ দিয়ে তো একজন ক্রিকেটারের গল্প শেষ হয়ে যায় না। সাইফও থেমে যাননি। বাংলাদেশের টেস্ট দলে ওপেনিং পজিশনে তখন চলছিল নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা। সাইফও পেয়েছেন একাধিক সুযোগ। কিন্তু ছয়টি টেস্ট ম্যাচ খেলেও নিজের জায়গাটা স্থায়ী করতে পারেননি তিনি। শেষ পর্যন্ত জাতীয় দলের বাইরে চলে যেতে হয় তাকে।
কিন্তু সাইফ হাসানের গল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—তিনি কখনো নিজের স্বপ্ন ছেড়ে দেননি। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, আধুনিক ক্রিকেটে শুধু টেস্ট ক্রিকেটের ব্যাটসম্যান হলে হবে না। ছোট ফরম্যাটেও নিজেকে প্রমাণ করতে হবে। নিজের ব্যাটিংয়ের শট খেলার পরিধি বাড়াতে শুরু করেন তিনি। ধীরে ধীরে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন।
১৯ নভেম্বর ২০২১ সালে পাকিস্তানের বিপক্ষে ঢাকায় সাইফ হাসানের টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক অভিষেক হয়। কিন্তু এখানেও পথটা খুব সহজ ছিল না। অল্প সময়ের মধ্যেই আবার জাতীয় দলের বাইরে চলে যেতে হয় তাকে। অনেকের কাছেই হয়তো মনে হয়েছিল, সাইফ হাসানের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার বুঝি থেমেই গেল।
কিন্তু সাইফের গল্পটা অন্যরকম। তিনি আবার ঘরোয়া ক্রিকেটে ফিরে যান। রান করেন, অনুশীলন করেন, নিজের দুর্বল জায়গাগুলো নিয়ে কাজ করেন এবং অপেক্ষা করতে থাকেন আরেকটি সুযোগের জন্য। কারণ তিনি জানতেন, ক্রিকেটে সুযোগ কখনো চিরদিনের জন্য হারিয়ে যায় না—যদি আপনি নিজেকে প্রস্তুত রাখেন।
২০২৫ সালে আবারও আলোচনায় ফিরে আসেন সাইফ হাসান। এশিয়া কাপে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে তার ব্যাট থেকে আসে গুরুত্বপূর্ণ ৬১ রানের ইনিংস। সেই ইনিংসে ছিল চারটি ছক্কা। চাপের ম্যাচে তার এই ব্যাটিং আবারও মনে করিয়ে দেয়—সাইফ হাসানের মধ্যে এখনো অনেক কিছু দেওয়ার আছে।
এরপর আসে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। ৮ অক্টোবর ২০২৫ সালে আফগানিস্তানের বিপক্ষে আবুধাবিতে ওয়ানডে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক হয় সাইফ হাসানের। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের তিন ফরম্যাটেই খেলার অভিজ্ঞতা অর্জন করেন তিনি—টেস্ট, ওয়ানডে এবং টি-টোয়েন্টি।
আর ২০২৬ সালেও তার লড়াই থামেনি। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ওয়ানডেতে ৫৭ রানের ইনিংস, অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টি-টোয়েন্টিতে ৪২ রান এবং জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ৫৫ রানের ইনিংস—এগুলো হয়তো ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ইনিংস নয়, কিন্তু সাইফ হাসানের ক্যারিয়ারে এগুলোর গুরুত্ব অনেক বেশি। কারণ প্রতিটি ইনিংস যেন একটা কথাই বলে—সাইফ এখনো হাল ছাড়েননি।
রিয়াদ থেকে বাংলাদেশ। ছোটবেলার ক্রিকেট থেকে ধানমন্ডির একাডেমি। পরিবারের সমর্থন থেকে ঘরোয়া ক্রিকেটে বড় ইনিংস। ১৮ বছর বয়সে ২০৪ রান থেকে জাতীয় দলের দরজা। টেস্ট অভিষেকে শূন্য থেকে দল থেকে বাদ পড়া। এরপর আবার ফিরে আসা। টি-টোয়েন্টি অভিষেক, ওয়ানডে অভিষেক, এশিয়া কাপ এবং নতুন করে জাতীয় দলে নিজের জায়গা তৈরি করার লড়াই—সাইফ হাসানের গল্প আসলে একজন ক্রিকেটারের শুধু সাফল্যের গল্প নয়, এটা বারবার ফিরে আসার গল্প।
কারণ ক্রিকেট আপনাকে শুধু শেখায় কীভাবে রান করতে হয়, কীভাবে উইকেট নিতে হয় কিংবা কীভাবে ম্যাচ জিততে হয়। ক্রিকেট শেখায় ব্যর্থতার পর আবার উঠে দাঁড়াতে হয় কীভাবে।
সাইফ হাসানের ক্যারিয়ারে ব্যর্থতা এসেছে, সমালোচনা এসেছে, দল থেকে বাদ পড়ার কষ্ট এসেছে। কিন্তু প্রতিবারই তিনি ফিরে এসেছেন ব্যাট হাতে। আর তার এই যাত্রার পেছনে রয়েছে বছরের পর বছর পরিশ্রম, পরিবারের সমর্থন এবং নিজের ওপর বিশ্বাস।
হয়তো এখনো সাইফ হাসানের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় অধ্যায় লেখা হয়নি। হয়তো সামনে আরও বড় ইনিংস অপেক্ষা করছে, আরও বড় ম্যাচ অপেক্ষা করছে, আরও বড় সুযোগ অপেক্ষা করছে।
তবে একটা বিষয় নিশ্চিত—সাইফ হাসানের গল্প এখনো শেষ হয়নি।
এটা একজন ক্রিকেটারের গল্প নয়, এটা একজন লড়াকু মানুষের গল্প।
এটা সাইফ হাসানের গল্প।

