ক্রিকেটে এমন কিছু গল্প থাকে, যেখানে সাফল্যের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে একজন ক্রিকেটারের লড়াই। বারবার চোট, ফর্মহীনতা কিংবা কঠিন সময় পেরিয়ে যিনি ফিরে এসেছেন নিজের পরিচিত ছন্দে। বাংলাদেশের ক্রিকেটে এমনই এক নাম—মুস্তাফিজুর রহমান। যাকে ক্রিকেট বিশ্ব চেনে ‘দ্য ফিজ’ কিংবা ‘কাটার মাস্টার’ নামে।
১৯৯৫ সালের ৬ সেপ্টেম্বর সাতক্ষীরায় জন্ম মুস্তাফিজুর রহমানের। ছোটবেলা থেকেই ক্রিকেটের প্রতি ছিল তার তীব্র আগ্রহ। সাতক্ষীরায় ক্রিকেট খেলার সময়ই তার প্রতিভা নজরে পড়ে স্থানীয় ক্রিকেট সংশ্লিষ্টদের। এরপর বয়সভিত্তিক ক্রিকেট পেরিয়ে জায়গা করে নেন বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ দলে। ২০১৪ অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে বাংলাদেশের হয়ে ছয় ম্যাচে নেন ৯ উইকেট। ঘরোয়া প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটেও অভিষেকের মৌসুমে ২৬ উইকেট নিয়ে জানান দেন নিজের সামর্থ্যের।
এরপর আসে ২০১৫ সাল। পাকিস্তানের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি দিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক। তবে বিশ্ব ক্রিকেটে নিজের আগমনী বার্তা দেন ভারতের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজে।
মাত্র ১৯ বছর বয়সে প্রথম দুই ওয়ানডেতে পাঁচ উইকেট করে নিয়ে মোট ১১ উইকেট শিকার করেন মুস্তাফিজুর। তৃতীয় ওয়ানডেতে আরও দুই উইকেট নিয়ে তিন ম্যাচের সিরিজ শেষ করেন ১৩ উইকেট দিয়ে। প্রথম দুই ওয়ানডেতে ১১ উইকেট নেওয়ার সেই কীর্তি আজও তার ক্যারিয়ারের অন্যতম স্মরণীয় অধ্যায়।
এরপর দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে টেস্ট অভিষেক। প্রথম টেস্টেই চার উইকেট। আর ওয়ানডে ও টেস্ট—দুই ফরম্যাটের অভিষেকেই ম্যাচসেরা হওয়ার বিরল কীর্তি গড়েন তিনি।
২০১৬ সালে মুস্তাফিজুরের সামনে খুলে যায় ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের দরজা। সানরাইজার্স হায়দরাবাদের হয়ে আইপিএলে খেলেন এবং প্রথম মৌসুমেই ১৭ ম্যাচে নেন ১৬ উইকেট। দলকে শিরোপা জেতাতে রাখেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। সেই দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের স্বীকৃতি হিসেবে জিতে নেন Emerging Player of the Tournament পুরস্কার।
কিন্তু এরপরই শুরু হয় কঠিন সময়। কাঁধের চোটে দীর্ঘদিন মাঠের বাইরে থাকতে হয় তাকে। একের পর এক ইনজুরি তার ক্যারিয়ারকে বারবার থামিয়ে দিয়েছে। কখনো কাঁধ, কখনো হ্যামস্ট্রিং, কখনো গোড়ালির সমস্যা—চোট যেন হয়ে উঠেছিল তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় বাধা।
তবুও প্রতিবারই ফিরে এসেছেন মুস্তাফিজুর।
২০১৯ বিশ্বকাপ ছিল তার ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা অধ্যায়। পাকিস্তানের বিপক্ষে নিজের ১০০তম ওয়ানডে উইকেট পূর্ণ করেন তিনি। পুরো বিশ্বকাপে মাত্র আট ম্যাচে নেন ২০ উইকেট। বাংলাদেশের হয়ে টুর্নামেন্টে সর্বোচ্চ উইকেটশিকারি ছিলেন এই বাঁহাতি পেসার।
আইপিএলেও একের পর এক দলের হয়ে খেলেছেন তিনি। সানরাইজার্স হায়দরাবাদের পর মুম্বাই ইন্ডিয়ান্স, রাজস্থান রয়্যালস এবং দিল্লি ক্যাপিটালসের জার্সি গায়ে তুলেছেন। বিশ্বের বিভিন্ন ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগেও খেলেছেন বাংলাদেশের এই তারকা পেসার।
তবে মুস্তাফিজুরের আসল পরিচয় তার সংখ্যার বাইরেও। তার বোলিংয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল কাটার, স্লোয়ার, ভ্যারিয়েশন এবং ব্যাটারকে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বিভ্রান্ত করে রাখার ক্ষমতা। একই অ্যাকশন থেকে ভিন্ন গতির বল করার দক্ষতাই তাকে করে তুলেছিল অন্যদের থেকে আলাদা।
ক্যারিয়ারের পরিসংখ্যানও তার দীর্ঘ পথচলার সাক্ষী। টেস্টে ১৫ ম্যাচে ৩১ উইকেট, ওয়ানডেতে ১২৪ ম্যাচে ১৯৩ উইকেট এবং টি-টোয়েন্টিতে ১২৮ ম্যাচে ১৬০ উইকেট। আইপিএলেও ৬০ ম্যাচে তার শিকার ৬৫ উইকেট।
অর্থাৎ আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের তিন ফরম্যাট মিলিয়ে বাংলাদেশের হয়ে তার উইকেট সংখ্যা প্রায় চারশোর কাছাকাছি। আর এই দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তিনি খেলেছেন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ এ, বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ থেকে শুরু করে সানরাইজার্স হায়দরাবাদ, মুম্বাই ইন্ডিয়ান্স, রাজস্থান রয়্যালস, দিল্লি ক্যাপিটালস, লাহোর কালান্দার্সসহ বিশ্বের বিভিন্ন দলের হয়ে।
২০১৫ সালে যে তরুণ পেসার ভারতকে কাঁপিয়ে বিশ্ব ক্রিকেটে নিজের নাম লিখিয়েছিলেন, সময়ের সঙ্গে সেই মুস্তাফিজুর আজ বাংলাদেশের অন্যতম অভিজ্ঞ পেসার।
তার গল্প নিখুঁত কোনো সাফল্যের গল্প নয়। এই গল্পে আছে উত্থান, পতন, চোট, অপেক্ষা, সমালোচনা এবং প্রত্যাবর্তন। কিন্তু সবকিছুর পরেও একটা জিনিস একই থেকেছে—ফিরে আসার মানসিকতা।
সাতক্ষীরার মাঠ থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় মঞ্চ, আইপিএলের আলো থেকে বিশ্বকাপের লড়াই—মুস্তাফিজুর রহমানের যাত্রা তাই শুধু একজন ক্রিকেটারের ক্যারিয়ার নয়।
এটি একজন প্রতিভাবান তরুণের বিশ্বমানের বোলারে পরিণত হওয়ার গল্প।
তিনি মুস্তাফিজুর রহমান—বাংলাদেশের কাটার মাস্টার, দ্য ফিজ।

