কয়েক দিন আগে শেষ হওয়া অস্ট্রেলিয়া সফর বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে আলাদা জায়গা করে নেবে। ২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে গিয়ে ডারউইনে প্যাট কামিন্সদের হারিয়েছে টাইগাররা। ম্যাকাইয়ে দ্বিতীয় টেস্টে বড় ব্যবধানে হারলেও শেষ পর্যন্ত সিরিজ শেষ হয়েছে ১–১ সমতায়।দলের জন্য সফরটি স্মরণীয় হয়ে থাকলেও, লিটন দাসের ব্যক্তিগত স্মৃতিতে এই সফরের গল্পটা লেখা থাকবে একটু ভিন্নভাবেই। দুই টেস্টে তিনবার ব্যাট হাতে নেমে প্রতিবারই ফিরেছেন শূন্য রানে। দুই বার উইকেটের পিছনে ক্যাচ দিয়ে, আরেকবার এলবিডব্লিউ হয়ে থেমেছেন এই উইকেটকিপার–ব্যাটসম্যান। এমনকি শেষবার আম্পায়ার শুরুতে আউট না দিলেও মিচেল স্টার্কের রিভিউয়ে বদলে যায় সিদ্ধান্তটি। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ব্যাট হাতে লিটনের গল্পটা যেখানে হতাশার, আর সেখানেই উল্টো আরেক চিত্র ডিআরএসে। রিভিউ নেওয়ার ক্ষেত্রে গত এক দশকে বিশ্ব ক্রিকেটের অন্যতম সফলদের একজন লিটন কুমার দাস । পরিসংখ্যান বলছে, গত ১০ বছরের টেস্টে লিটনের নেওয়া রিভিউয়ের মাধ্যমে আম্পায়ারের সিদ্ধান্ত বদলের হার বিশ্বের সবার ওপরে। অর্থাৎ ব্যাট হাতে শূন্যের হতাশা থাকলেও, ডিআরএসে লিটন যেন হয়ে উঠেছেন বাংলাদেশের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সিদ্ধান্তদাতাদের একজন।
বাংলাদেশ–অস্ট্রেলিয়া সিরিজ শেষ হওয়ার পর Cricbuzzer হালনাগাদ পরিসংখ্যানে লিটন দাসের জন্য উঠে এসেছে দারুণ এক তথ্য। ২০১৬ সাল থেকে অন্তত ১৫টি ডিআরএস নেওয়া ৩৫ জন ব্যাটসম্যানের মধ্যে রিভিউ সাফল্যের হারে সবার ওপরে বাংলাদেশের এই উইকেটকিপার–ব্যাটসম্যানের। লিটন এখন পর্যন্ত ১৬টি রিভিউ নিয়েছেন, যার মধ্যে ১১টিতেই আম্পায়ারের সিদ্ধান্ত বদলেছে। অর্থাৎ তাঁর রিভিউ সাফল্যের হার ৬৮ দশমিক ৮ শতাংশ। সহজ করে বললে, ডিআরএস নেওয়ার পর প্রায় প্রতি তিনবারে দুবারই লিটনের সিদ্ধান্তই শেষ পর্যন্ত সঠিক প্রমাণিত হয়েছেন। এই তালিকায় লিটনের পর আছেন ভারতের সাবেক টেস্ট ব্যাটসম্যান চেতেশ্বর পূজারা। ১৫টি রিভিউ নিয়ে ৯টিতে সিদ্ধান্ত বদলাতে সক্ষম হয়েছেন তিনি, সাফল্যের হার ৬০ শতাংশ। তৃতীয় স্থানে থাকা ওয়েস্ট ইন্ডিজের Kraigg Brathwaite ১৮টি রিভিউয়ের মধ্যে ১০টিতে সফল হয়েছেন, তাঁর সাফল্যের হার ৫৫ দশমিক ৬ শতাংশ। অর্থাৎ, টেস্ট ক্রিকেটে নিয়মিত ডিআরএস নেওয়া ব্যাটসম্যানদের মধ্যে সিদ্ধান্ত যাচাইয়ের ক্ষেত্রে লিটনের চেয়ে বেশি নির্ভুল আর কেউ নেই। অস্ট্রেলিয়া সফরে ব্যাট হাতে তিনবার শূন্য রানে ফেরার হতাশার মাঝেও তাই ডিআরএসে নিজের অন্য এক দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছেন লিটন—যেখানে তাঁর সিদ্ধান্তই সবচেয়ে বেশি বদলে দিয়েছে আম্পায়ারের সিদ্ধান্ত।
২০১৬ সাল থেকে টেস্টে অন্তত ১৫টি ডিআরএস নেওয়া ৫৮ বোলারের মধ্যে সাফল্যের হারে সবার ওপরে ওয়েস্ট ইন্ডিজের কেমার রোচ। তাঁর ৪০টি রিভিউ নিয়ে ১৪টিতেই আম্পায়ারের সিদ্ধান্ত বদলাতে পেরেছেন এই পেসার, সাফল্যের হার ৩৫ শতাংশ। তালিকায় রোচের পরেই রয়েছেন ইংল্যান্ডের ক্রিস ওকস। ৩৪টি রিভিউয়ের মধ্যে ১০টিতে সফল হয়েছেন তিনি, যা ২৯ দশমিক ৪ শতাংশ। আর ওকসের সতীর্থ Stuart Broad সাফল্যের হার ২৯ দশমিক ১ শতাংশ—৫৫টি রিভিউ নিয়ে সফল হয়েছেন ১৬টিতে। আর এখানেই লিটন দাসের কীর্তিটা আরও বেশি চোখে পড়ে। বোলারদের মধ্যে সবার ওপরে থাকা কেমার রোচের ডিআরএস সাফল্যের হার যেখানে ৩৫ শতাংশ, সেখানে লিটনের ৬৮ দশমিক ৮ শতাংশ—অর্থাৎ প্রায় দ্বিগুণ।
ব্যাটসম্যানের প্যাডে বল লাগল কি না, ব্যাটে সামান্য স্পর্শ ছিল কি না কিংবা বলের গতিপথ ঠিক কোন দিকে—এসব সূক্ষ্ম হিসাব মুহূর্তের মধ্যেই বুঝে নেওয়ার বিষয়। আর ডিআরএসের পরিসংখ্যান বলছে, সেই হিসাবটা লিটনের চোখে বেশ পরিষ্কারই ধরা পড়ে। ব্যাট হাতে অস্ট্রেলিয়া সফরটা তাঁর জন্য হতাশার হলেও, ডিআরএসে লিটন যেন দেখিয়েছেন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক দক্ষতা। আম্পায়ারের সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করার ক্ষেত্রে তাঁর বিচারবোধ যে কতটা নির্ভুল, ৬৮ দশমিক ৮ শতাংশ সাফল্যের হারই তার বড় প্রমাণ।

