একসময় যে ছেলেটি টেনিস বল হাতে গ্রামের মাঠে ক্রিকেট খেলতেন, আজ তাঁর হাতে উঠে এসেছে ১৫০ কিলোমিটারের বেশি গতির আগুন।চাঁপাইনবাবগঞ্জের পদ্মাপাড় থেকে উঠে আসা সেই তরুণই এখন বাংলাদেশের ক্রিকেটে গতির নতুন বিস্ময়—নাহিদ রানা।
ক্রিকেট শুরু করেছিলেন অন্যদের তুলনায় অনেক দেরিতে, এমনকি ১৮ বছর বয়সের আগে আসল ক্রিকেট বলই ছোঁয়া হয়নি তাঁর। কিন্তু স্বপ্নটা ছিল অনেক বড়, আর সেই স্বপ্ন পূরণ করতে প্রতিদিন পাড়ি দিতে হয়েছে ৬০ কিলোমিটার পথ।
অভাব, বাধা আর অসংখ্য প্রতিকূলতা পেরিয়ে কীভাবে একজন সাধারণ পরিবারের ছেলে হয়ে উঠলেন বাংলাদেশের অন্যতম ভয়ংকর গতির পেসার— আজকে এই বিষয় নিয়ে আলোচনা করবো চাঁপাইনবাবগঞ্জের পদ্মাপাড়ের এক সাধারণ পরিবারে জন্ম নাহিদ রানার।
ছোটবেলায় অন্য অনেক শিশুর মতোই টেনিস বল দিয়ে ক্রিকেট খেলতেন তিনি। তখন হয়তো কেউ ভাবেনি, এই ছেলেটিই একদিন বাংলাদেশের ক্রিকেটে গতির নতুন সংজ্ঞা লিখবেন।স্কুলে শিক্ষক বনাম ছাত্রদের এক ম্যাচে প্রথমবার বল করার সুযোগ পান নাহিদ। আর সেখানেই দেখা যায় তাঁর অস্বাভাবিক গতি। তাঁর বল এত দ্রুত ছুটে আসছিল যে, শিক্ষক ও উইকেটরক্ষক—দুজনেরই বল সামলাতে সমস্যা হচ্ছিল।
কিন্তু নাহিদের ক্রিকেটযাত্রা ছিল মোটেও সহজ নয়। ২০২০ সালে উচ্চমাধ্যমিক পাস করার পর রাজশাহীর ক্লিমন ক্রিকেট একাডেমিতে ভর্তি হন তিনি। অবাক করার মতো বিষয় হলো—১৮ বছর বয়সের আগ পর্যন্ত তিনি কখনো আসল ক্রিকেট বলেই খেলেননি।
অন্যরা যখন ছোটবেলা থেকেই ক্রিকেটের সঙ্গে পরিচিত, নাহিদ তখন শুরু করলেন প্রায় শূন্য থেকে।রাজশাহী বিভাগের ব্যাটসম্যানদের অনুশীলনে নেট বোলার হিসেবে বল করা শুরু করেন তিনি। কোনো পারিশ্রমিক নয়, কোনো বড় পরিচয় নয়—শুধু একটাই লক্ষ্য, ক্রিকেট শেখা এবং নিজের গতি কাজে লাগানো।
প্রতিদিন চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে রাজশাহী। প্রায় ৩০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে অনুশীলনে যেতেন নাহিদ। অনুশীলন শেষে আবার ৩০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে বাড়ি ফিরতেন। অর্থাৎ প্রতিদিন প্রায় ৬০ কিলোমিটারের যাত্রা।পরিবারের আর্থিক অবস্থাও ছিল সাধারণ। ভালো স্পাইক জুতো কেনার সামর্থ্য ছিল না। সাধারণ জুতো পরেই অনুশীলন করতে হয়েছে তাঁকে।
তাঁর বাবা চেয়েছিলেন ছেলে পড়াশোনা করে একটি চাকরি করুক। কিন্তু নাহিদের মাথায় তখন শুধু ক্রিকেট। ক্রিকেটের জন্য বাবার ইচ্ছার বিরুদ্ধেও যেতে হয়েছে তাঁকে। আর যেহেতু দেরিতে ক্রিকেট শুরু করেছিলেন, তাই অন্যদের তুলনায় তাঁকে করতে হয়েছে আরও বেশি পরিশ্রম।
রোদে ঘণ্টার পর ঘণ্টা নেটে বল করে গেছেন। বারবার চেষ্টা করেছেন নিজের লাইন, লেংথ আর গতি ঠিক করতে। রাজশাহী স্টেডিয়ামে মূল দলের অনুশীলনে তিনি ছিলেন শুধু একজন নেট বোলার। কিন্তু তাঁর হাতে তখন ছিল এমন এক অস্ত্র, যা খুব দ্রুতই নির্বাচকদের নজরে পড়ে—অস্বাভাবিক গতি।
নেটে তাঁর বলের গতি দেখে নির্বাচক ও কোচরা বুঝতে পারেন, এই তরুণের মধ্যে রয়েছে বিশেষ কিছু। সেখান থেকেই বদলে যেতে শুরু করে নাহিদ রানার জীবন।২০২১ সালে রাজশাহী বিভাগের হয়ে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে অভিষেক হয় তাঁর। আর খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ঘরোয়া ক্রিকেটে নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দেন নাহিদ।
জাতীয় ক্রিকেট লিগে মাত্র ছয় ম্যাচে ৩২ উইকেট নিয়ে আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসেন এই তরুণ পেসার। এরপর বিপিএলে খুলনা টাইগার্স ও রংপুর রাইডার্সের হয়ে বল হাতে নজর কাড়েন তিনি। ধীরে ধীরে নাহিদের নাম ছড়িয়ে পড়ে দেশের ক্রিকেটে। ২০২০ সালের অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপের ট্রায়ালেও তাঁর গতি নির্বাচকদের নজরে এসেছিল। মূল দলে সুযোগ না পেলেও স্ট্যান্ডবাই খেলোয়াড় হিসেবে ছিলেন তিনি।
অবশেষে আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। ২০২৪ সালের মার্চে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে টেস্ট অভিষেক হয় নাহিদ রানার।আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পা রেখেই তিনি বুঝিয়ে দেন—তিনি শুধু একজন সাধারণ পেসার নন। গতির দিক থেকেও তৈরি করেন ইতিহাস।পাকিস্তানের বিপক্ষে ঘণ্টায় ১৫২ কিলোমিটার গতিতে বল করে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাংলাদেশের কোনো বোলারের দ্রুততম বলের রেকর্ড গড়েন নাহিদ রানা।
তবে তাঁর সাফল্য শুধু গতিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি। ২০২৬ সালে একের পর এক বিধ্বংসী স্পেলে তিনি ব্যাটসম্যানদের জন্য আতঙ্ক হয়ে ওঠেন। ১১ মার্চ মিরপুরে পাকিস্তানের বিপক্ষে মাত্র ২৪ রান দিয়ে পাঁচ উইকেট নিয়ে পাকিস্তানের ব্যাটিং লাইনআপে ধস নামান তিনি।
এরপর ২০ এপ্রিল নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ৩২ রানে পাঁচ উইকেট নিয়ে ঘরের মাঠে ওয়ানডেতে নিজের সামর্থ্যের আরেকটি বড় প্রমাণ দেন। আর ৬ জুলাই হারারেতে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে আসে তাঁর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় ব্যক্তিগত সাফল্য। ১০ ওভারে মাত্র ২১ রান দিয়ে ছয় উইকেট!
এই দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের মাধ্যমে বাংলাদেশের ওয়ানডে ইতিহাসের সেরা বোলিং ফিগারের রেকর্ড নিজের নামে করে নেন নাহিদ রানা। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষেও বল হাতে আলো ছড়িয়েছেন তিনি। শক্তিশালী অজি ব্যাটিং লাইনআপের বিপক্ষে ১০ ওভারে ৪১ রান দিয়ে শিকার করেন চার উইকেট।
একজন তরুণ পেসারের জন্য এমন ধারাবাহিক পারফরম্যান্স তাঁকে নিয়ে প্রত্যাশা আরও বাড়িয়ে দেয়। অসাধারণ পারফরম্যান্সের স্বীকৃতিও আসে। ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে আইসিসির মাসসেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার জিতে নেন নাহিদ রানা।
কিন্তু ক্রিকেটে যেমন সাফল্য আছে, তেমনি আছে চ্যালেঞ্জও। ১৭ জুলাই ২০২৬ জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে দ্বিতীয় টি-টোয়েন্টি ম্যাচে বোলিং করার সময় বাঁ পাঁজরের পাশে টান অনুভব করেন নাহিদ।
মাত্র ২.৩ ওভার বল করার পরই ব্যথার কারণে মাঠ ছাড়তে হয় তাঁকে। পরবর্তীতে স্ক্যান রিপোর্টে ধরা পড়ে গ্রেড-২ সাইড স্ট্রেইন। এই চোট তাঁর জন্য হয়ে ওঠে বড় ধাক্কা। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশের টেস্ট সিরিজে নাহিদ রানাকে দলের অন্যতম প্রধান পেস অস্ত্র হিসেবে ভাবা হয়েছিল। কিন্তু ইনজুরির কারণে সেই সিরিজ থেকে ছিটকে যেতে হয় তাঁকে।
চিকিৎসকদের মতে, পুরোপুরি সুস্থ হতে তাঁর প্রায় ৬ থেকে ৮ সপ্তাহ সময় লাগতে পারে। অস্ট্রেলিয়া সফরে বাংলাদেশ দল যখন মাঠে নামছে, তখন নাহিদকে থাকতে হচ্ছে মাঠের বাইরে—পুনর্বাসনের কঠিন সময় পার করে।
তবে নাহিদ রানার গল্প এখানেই শেষ নয়। কারণ তাঁর গল্প শুধু একজন ক্রিকেটারের গল্প নয়। এটি এমন একজন তরুণের গল্প, যিনি দেরিতে ক্রিকেট শুরু করেছিলেন। যার পরিবারের সামর্থ্য ছিল সীমিত। যার ভালো জুতো কেনার সামর্থ্য ছিল না।যাকে প্রতিদিন ৬০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে অনুশীলনে যেতে হয়েছে।
যাকে বাবার ইচ্ছার বিরুদ্ধেও নিজের স্বপ্নের পেছনে ছুটতে হয়েছে। আর সেই ছেলেটিই আজ বাংলাদেশের ক্রিকেটের অন্যতম দ্রুতগতির পেসার। টেনিস বল থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের ১৫০ কিলোমিটারের বেশি গতির বল—নাহিদ রানার পথটা ছিল সংগ্রামে ভরা।
তিনি প্রমাণ করেছেন, সুযোগ দেরিতে এলেও স্বপ্ন দেরিতে পূরণ হতে বাধ্য নয়। প্রয়োজন শুধু কঠোর পরিশ্রম, আত্মবিশ্বাস আর নিজের লক্ষ্যের প্রতি অটুট বিশ্বাস।নাহিদ রানার গল্প তাই কেবল গতির গল্প নয়। এটি স্বপ্ন দেখার গল্প। সংগ্রাম করে উঠে আসার গল্প।
আর নিজের সামর্থ্য দিয়ে বিশ্বকে জানান দেওয়ার গল্প— বাংলাদেশের মাটিতেও জন্ম নিতে পারে বিশ্বমানের গতির তারকা।

